বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীন পরিচালিত ঢাকা-কিশোরগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ টু ঢাকা রুটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন “এগারো সিন্ধুর প্রভাতী”—যেটি প্রতিদিন শত শত যাত্রী বহন করে দুই জেলার মধ্যে যাতায়াতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম-সেই ট্রেনেই চলছে চরম অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার নগ্ন প্রদর্শনী।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিলো, টিকিট ছাড়াই যাত্রী ওঠানোর ঘটনা ঘটছে এই ট্রেনে। তবে এবার আর অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বিষয়টি। আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টার দিকে, কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে ঢাকাগামী এগারো সিন্ধুর প্রভাতী ট্রেনটি ছাড়ার আগমুহূর্তে একজন যাত্রীকে বিনা টিকিটে ট্রেনে তুলতে দেখা যায়, এবং তাৎক্ষণিকভাবে হাতেনাতে আটক করা হয়। ম্যানেজারের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে৷ ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রেনটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার অস্পষ্ট বক্তব্য দেন এবং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, “এটা হয়তো স্টাফদের ভুল হতে পারে।” এই ধরনের উত্তর রেল কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলছে।
রেলপুলিশ: কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস৷ এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার এক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন “বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠানো আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিদিন টহল ও মনিটরিং চালানো হয়। কেউ এমন অনিয়মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে বৈধ প্রক্রিয়ায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র যাত্রী নয়, যদি রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এমন কাজে জড়িত প্রমাণিত হয়, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা নিয়মিতভাবে মনিটরিং করে থাকি, তবে প্রতিটি ট্রেনের অভ্যন্তরীন নিয়ন্ত্রণ ট্রেন পরিচালনাকারী টিমের উপর নির্ভর করে। তবুও আমি বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা না ঘটে।”
প্রতিদিনের বাস্তবতা: টিকিটধারী যাত্রীরাই যেন অনাহূত!
নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, ট্রেনে উঠে অধিকাংশ সময়েই নিজের নির্ধারিত আসনে বসা যায় না, কারণ আগে থেকেই সিট দখল করে রেখেছে বিনা টিকিটের যাত্রী। এর ফলে টিকিট কিনেও দাঁড়িয়ে বা গেটের কাছে বসে যাতায়াত করতে হয়—যা অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য। সালমা বেগম, এক নিয়মিত নারী যাত্রী বলেন “মেয়ে বাচ্চা নিয়ে ট্রেনে উঠি, কিন্তু আসন পাই না। কারণ ট্রেন উঠতেই দেখি দালাল চক্রের লোকজন আগেই সিট দখল করে রেখেছে, যাদের টিকিটই নেই "এগারো সিন্ধুর প্রভাতী" আন্তঃনগর ট্রেনটি ২০০২ সালের ১৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে। এটি পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে পরিচালিত হয়।
প্রতিদিন ট্রেনটি ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা—দুই দিকেই চলাচল করে।ট্রেনের ভাড়া শোভন: ১২০ টাকা, শোভন চেয়ার: ১৪০ টাকা, প্রথম সিট: ১৮৫ টাকা অনলাইনে টিকিট কাটলে ২০ টাকা অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীরা৷ বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠানোর কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা—যারা নিয়ম মেনে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠছেন। এই অনিয়মের ফলে রেলওয়ের সেবার মান যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং এদের সাথে রেলওয়ের কিছু অভ্যন্তরীণ অসাধু ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। রেলপথ বিশ্লেষক ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিন খান বলেন “এই পরিস্থিতি রোধে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে ট্রেনে ও স্টেশনে সিসিটিভি মনিটরিং জোরদার করা৷
প্রতিটি যাত্রায় ভ্রাম্যমাণ টিকিট চেকিং টিম মোতায়েন৷ ম্যানেজার, গার্ড ও কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা৷
অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি ও বরখাস্ত নিশ্চিত করা৷ ডিজিটাল টিকিটিং ও সিট অ্যালোকেশন সিস্টেম চালু করা”
রেলওয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন অব্যবস্থাপনা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। “এগারো সিন্ধুর প্রভাতী”-তে বিনা টিকিটে যাত্রী ওঠানো এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতির প্রতিফলন। প্রশাসনের উচিত, এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ট্রেনেই আর টিকিটবিহীন যাত্রী না ওঠে।
স্বাধীন একাত্তর